শিক্ষকতা থেকে সফল কৃষি উদ্যোক্তা, ড্রাগন চাষে বছরে আয় ৩০ লাখ টাকা

প্রকাশঃ জুলাই ১, ২০২৬ সময়ঃ ১১:০৭ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১১:১০ অপরাহ্ণ

পেশায় স্কুল শিক্ষক হলেও কৃষিকেই বাড়তি আয়ের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বরগুনার হাসানুল হক উজ্জ্বল। চার বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করেছিলেন তিনি। সেই ছোট উদ্যোগ এখন পরিণত হয়েছে সফল একটি কৃষি খামারে। বর্তমানে তিনটি বাগান থেকে বছরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি করছেন তিনি। তার এই সাফল্য স্থানীয় কৃষকদেরও নতুন করে ড্রাগন চাষে আগ্রহী করে তুলেছে।

বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা হাসানুল হক উজ্জ্বল স্থানীয় নিমতলী আজিজাবাদ চরমাইঠা বিদ্যালয়ের কৃষি বিজ্ঞানের শিক্ষক। বাড়ির অব্যবহৃত জমিকে কাজে লাগিয়ে বাড়তি আয়ের লক্ষ্যেই ২০২১ সালে প্রায় দুই একর জমিতে ১ হাজার ১০০টি পিলার স্থাপন করে ড্রাগনের বাগান গড়ে তোলেন। প্রথম বছরের সফলতার পর ধীরে ধীরে বাগানের পরিধি বাড়িয়ে এখন তিন একর জমিতে তিনটি বাগান পরিচালনা করছেন।

উজ্জ্বল জানান, শুরুতে এটি ছিল একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। কিন্তু অল্প সময়েই ফলন ও বাজারমূল্য আশাব্যঞ্জক হওয়ায় তিনি চাষ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে প্রতিবছর গড়ে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও দুই একর জমিতে নতুন বাগান করার পরিকল্পনাও রয়েছে তার।

শুধু নিজের আয়ই বাড়েনি, তার এই উদ্যোগে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। ফলের মৌসুমে ৮ থেকে ১০ জন নারী-পুরুষ বাগানে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে কাজ করেন। তাদের অনেকেই নিয়মিত বেতন পেয়ে পরিবার চালাচ্ছেন।

বাগান ঘুরে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে স্থাপন করা কংক্রিটের পিলারের ওপর ছড়িয়ে আছে ড্রাগনের গাছ। কোথাও সাদা ফুল ফুটেছে, কোথাও কাঁচা ফল, আবার কোথাও ঝুলছে লাল টসটসে পাকা ড্রাগন। প্রতিদিন সকালে শ্রমিকরা পাকা ফল সংগ্রহ করে আকার অনুযায়ী বাছাই করেন। পরে সেগুলো স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বরিশাল ও ঢাকার পাইকারদের কাছে পাঠানো হয়।

উজ্জ্বল জানান, প্রথম বছরেই ভালো সাড়া পেয়েছিলেন। ২০২২ সালে তার বাগান থেকে প্রায় সাড়ে ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি হয়। পরের বছর বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ লাখ টাকায়। যদিও ২০২৪ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফলন কমে যাওয়ায় আয় কমেছিল। তবে ২০২৫ সালে আবারও বিক্রি বেড়ে ২৬ লাখ টাকায় পৌঁছায়। চলতি বছরও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল বিক্রি হয়েছে এবং মৌসুম শেষে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার বিক্রির আশা করছেন তিনি।

ড্রাগন চাষে আগ্রহী হওয়ার পেছনের গল্পও শোনান এই শিক্ষক। তিনি বলেন, বাড়ির পুরোনো কাঠের গাছ থেকে প্রত্যাশিত লাভ না হওয়ায় বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে শুরু করেন। বিভিন্ন ফলের বাগান ঘুরে দেখার পর ড্রাগন চাষকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মনে হয়। পরে কৃষি কর্মকর্তা ও অভিজ্ঞ চাষিদের পরামর্শ নিয়ে শুরু করেন এই যাত্রা। বাগান থেকে পাওয়া লাভের অর্থে তিনি একটি দোতলা বাড়িও নির্মাণ করেছেন।

উজ্জ্বলের সফলতা দেখে তার স্বজন ও প্রতিবেশীরাও ড্রাগন চাষে আগ্রহী হয়েছেন। তার চাচাতো ভাই মো. কামাল জানান, উজ্জ্বলের পরামর্শে তিনিও ছোট পরিসরে ড্রাগন চাষ শুরু করেছেন। বর্তমানে তার বাগান থেকেও বছরে কয়েক লাখ টাকার ফল বিক্রি হচ্ছে এবং খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভ থাকছে।

স্থানীয় শ্রমিক সুমন ও সেলিম মল্লিক জানান, উজ্জ্বলের বাগানে কাজ করে তারা নিয়মিত আয় করছেন। এতে তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হয়েছে।

বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, জেলায় ড্রাগন চাষ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আগে এ অঞ্চলে এই ফলের চাষ ছিল না, এখন স্থানীয় উৎপাদনেই জেলার চাহিদা পূরণ হচ্ছে, পাশাপাশি অন্য জেলাতেও সরবরাহ করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, কৃষকদের কারিগরি পরামর্শ, প্রশিক্ষণ, চারা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করছে কৃষি বিভাগ। তার মতে, শিক্ষক হাসানুল হক উজ্জ্বল বরগুনার কৃষিতে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। তার সাফল্য অন্য কৃষকদেরও আধুনিক ও লাভজনক ফল চাষে উৎসাহিত করছে।

প্রতি / এডি / শাআ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য



আর্কাইভ

July 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G